রুপান্তর বাংলা স্টাফ রিপোর্টার–ঢাকা: কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরও পুলিশ বাহিনীতে বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নে অবাধে চলছে তদবির ও ঘুষ বাণিজ্য। লাখ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এই অনৈতিক প্রভাব বলয়।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ, সিনিয়র কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। যোগ্য ব্যক্তিদেরকে অপরাধ প্রবণতা যেসব অঞ্চলে বেশি সেসব জায়গায় না দিয়ে তথাকথিত অঞ্চলে দেওয়া হয়।
বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত দাপ্তরিক নিয়মে না হয়ে নাম এবং বিপি নম্বর লেখা অনানুষ্ঠানিক স্লিপের মাধ্যমে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখন রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী সুপারিশের তালিকা সামাল দিতে হচ্ছে। এতে মন্ত্রণালয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, মূলত বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এই অবৈধ বদলির বাজার। এতে জড়িত আছেন কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সদর দপ্তরের মাধ্যমে বদলির কথিত রেট:
কনস্টেবল: ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা
এএসআই- প্রায় দেড় লাখ টাকা
এসআই-প্রায় আড়াই লাখ টাকা
ইন্সপেক্টর-প্রায় ৪ লাখ টাকা
প্রত্যন্ত অঞ্চলের রেটটা বেড়ে যায়।
আঞ্চলিক রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটনে রেট কিছুটা কম। তবে নেতৃত্বের পর্যায়ে লেনদেন বহুগুণ। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ জেলার এসপি বদলিতে ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
কোটি টাকার এসপি পদায়ন চুক্তির অভিযোগ
সম্প্রতি মো. রিয়াজুল ইসলামকে মৌলভীবাজারের এসপি হিসেবে নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। বলা হয় কোটি কোটি টাকার অবৈধ চুক্তির মাধ্যমে তিনি পোস্টিং পেয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
আরেক অভিযোগে জানা যায়, মিরপুরের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের স্ত্রী তার এসপি ভাইয়ের জন্য গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা রাজশাহীর মতো জেলায় পোস্টিং চেয়ে ১৫ কোটি টাকার স্ট্যাম্পে লেনদেন করেছেন।
রাজনৈতিক বিভাজন ও পদোন্নতিতে অনিয়ম
পুলিশ বাহিনীর ভেতরে অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ বাড়ছে। ইন্সপেক্টর ও তার উপরের পদে স্পষ্ট উপদল তৈরি হয়েছে। বগুড়া জেলা ও গাবতলী উপজেলার কর্মকর্তারা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত। দাপ্তরিক নিয়ম না মেনে কিছু কর্মকর্তা সহকর্মীদের জামায়াত বা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে তালিকা করে তদবিরের সুবিধা নিচ্ছেন।
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করার প্রবণতা আরও বেড়েছে। এর জেরে র্যাবের অতিরিক্ত ডিজি ফারুক আহমেদ ডিএমপি কমিশনার পদের দৌড় থেকে বাদ পড়েন। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলামকে প্রটেকশন অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি বিভাগে বদলি করা হয়।
এই অসন্তোষের জেরে ডিআইজি আলী আকবর খান গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পদে নিয়োগ এবং পাঁচজনকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিতে দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদত্যাগ করেছেন।
সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তদবিরকে অসহনীয় দুর্নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্ত্রণালয়ে যাতায়াত নিষেধ করেন। আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরও সতর্ক করেন তদবিরের মাধ্যমে পাওয়া পোস্টিং বাতিল হবে।
তবে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন বলেন, “তদবির হতেই পারে, এটি স্বাভাবিক। প্রত্যেকেই পছন্দের জায়গা চান। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যৌক্তিকতার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়।”
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, “এই পদায়ন বাণিজ্য দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এর ফলে পুলিশি সেবার মান কমে যাবে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়।
সূত্র বলছে,পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাভাবিক বদলি, এপিবিএন, র্যাব, এটিইউ, ট্যুরিস্ট পুলিশকে অনেকে শাস্তিমূলক বদলি মনে করেন।
আর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম রেঞ্জ সবার কাছে কাঙ্ক্ষিত। কারণ এখানে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাণিজ্য বন্ধ না হলে বাহিনীতে পেশাদারিত্ব ও জনগণের আস্থা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
