মোঃ মোশারফ হোসেন সেলিম স্টাফ রিপোর্টার রাঙ্গামাটি—-পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার চারটি উপজেলার ২০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটস। সহযোগিতায় রয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)। প্রকল্পটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হবে।
সোমবার (৩ আগস্ট) এ উপলক্ষে জেলা পর্যায়ে প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সভায় প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বাস্তবায়ন কৌশল, উপকারভোগী নির্বাচন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং মা ও শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটসের নির্বাহী পরিচালক বিপ্লব চাকমা । প্রধান অতিথি ছিলেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মিজ নাজমা আশরাফী । বিশেষ অতিথি ছিলেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য নাইউপ্রু মেরি, সিভিল সার্জন নূয়েন খীসা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. মোবারক হোসেন এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক অনুকা খীসা ।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, সাপছড়ি, বালুখালী ও কুতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন এনজিও প্রধান, হেডম্যান এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি সদর, কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলা এবং বান্দরবান সদর উপজেলা রয়েছে। এসব উপজেলার নির্ধারিত ২০টি ইউনিয়নে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পটির দুটি প্রধান স্তম্ভ হলো—মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি (MCBP) এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (DRR) ।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে MCBP কার্যক্রম এবং ইউনিয়ন পরিষদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে DRR কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিকভাবে দুর্গম, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এবং আর্থ-সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চল। পাহাড় ধস, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা ও সুপেয় পানির সংকট এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
বিশেষ করে দুর্যোগের সময় গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
প্রকল্পে গর্ভাবস্থা থেকে শিশুর জীবনের প্রথম ১,০০০ দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে পুষ্টির ঘাটতি শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রকল্পের আওতায় গর্ভবতী নারীদের গর্ভাবস্থার ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি মাসিক আর্থিক সহায়তা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
প্রকল্পের DRR অংশে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে Community Risk Assessment (CRA) বা কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ ঝুঁকি নিরূপণ করা হবে। এর ভিত্তিতে Risk Reduction Action Plan (RRAP) প্রণয়ন করা হবে।
ঝুঁকি হ্রাসে সুরক্ষা দেয়াল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুপেয় পানির স্থানসহ ছোট আকারের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ফার্স্ট এইড কিট সরবরাহ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কমিউনিটির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হবে।
জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কৌশলগত দিকনির্দেশনা, উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং এবং আন্তঃদপ্তর সমন্বয় করা হবে। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, এলজিইডি ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধিরা কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন।
ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, পাড়া কর্মী ও কমিউনিটি ভলান্টিয়াররা উপকারভোগী যাচাই, উঠান বৈঠক, দুর্যোগ ঝুঁকি নিরূপণ ও বিভিন্ন কার্যক্রম তদারক করবেন।
প্রকল্পের আওতায় উপকারভোগীদের তথ্য সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী Management Information System (MIS)-এ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ই-মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি দল সরেজমিনে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন ও গুণগত মান যাচাই করবে।
এ ছাড়া অভিযোগ প্রতিকারের জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনলাইন GRS এবং আশিকার স্থানীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি গ্রহণের মান উন্নত হবে এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, ঝুঁকি নিরূপণ ও ছোট অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘমেয়াদে পার্বত্য অঞ্চলে শিশুদের খর্বকায় (Stunting) ও কৃশকায় (Wasting) হওয়ার হার কমানো, শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়তা করা এবং দুর্যোগ-সহনশীল কমিউনিটি গড়ে তোলাই এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রকল্পের মাধ্যমে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি স্বাস্থ্যবান, সক্ষম ও দুর্যোগ-সহনশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
