মোঃ রিয়াজ উদ্দীন রানা–বর্তমান বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাটি একদিকে যেমন তথ্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম, অন্যদিকে তেমনি হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি পথ। সত্য প্রকাশের অপরাধে হুমকি, মামলা, হামলা আর নিপীড়ন—এখন অনেক সাংবাদিকের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি, অনিয়ম বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কলম ধরলেই অনেক সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ পাচ্ছেন প্রাণনাশের হুমকি, কেউবা হারাচ্ছেন চাকরি। আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন ধারায় মামলার ভয়ও তাড়া করছে।
*ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে কাজ*
রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলের অনেক স্থানীয় সাংবাদিক বলছেন, তারা এখন খবর লিখতে গিয়ে দশবার ভাবেন। কারণ, একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর যদি কারো স্বার্থে আঘাত লাগে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে হুমকি আসে। কেউ কেউ সরাসরি ফোন করে গালাগালি ও প্রাণনাশের ভয় দেখান। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলে কুৎসা রটনা ও মানহানিকর প্রচারণা।
*আইনের অপব্যবহার*
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানে নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
*জনগণের অধিকার বাধাগ্রস্ত*
গণমাধ্যমকর্মীরা মনে করেন, সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ, দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য তখন আর প্রকাশ পায় না। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুটোই দুর্বল হয়ে পড়ে।
*সাংবাদিকদের দাবি*
সাংবাদিক মহলের দাবি—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মিথ্যা মামলা ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় সরকার, প্রশাসন ও সুশীল সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে।
*জাতীয় সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদের চেয়ারম্যান যা বললেন*
এ বিষয়ে জাতীয় সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদের (জেএসকেপি) চেয়ারম্যান বলেন, “দেশব্যাপী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। মব সৃষ্টি করে যেমন মানুষের মন জয় করা যায় না, তেমনি সাংবাদিকের কলমকে থামিয়ে দিলে বিবেকের আলোও নেভানো যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে যখন যে সরকার আসে, তখন নিজের স্বার্থে সাংবাদিকদের গলা চেপে ধরে। মামলা-হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কলম থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কলম চালাতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে জীবন দিতে হয়েছে। অথচ বিনিময়ে সরকার সাংবাদিকদের জন্য কিছুই করেনি। যা কিছু করা হয়েছে, তা শুধু সরকারের অনুগত লোকদের জন্য।”
জেএসকেপি চেয়ারম্যান বলেন, “বাংলাদেশে কতজন সাংবাদিক রয়েছেন, তার সঠিক হিসাব সরকার বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। গ্রামবাংলায় প্রায় ৬৮ হাজার সাংবাদিক কাজ করলেও তাদের কোনো তালিকা সংরক্ষিত নেই। একইভাবে দেশে কতজন সাংবাদিক নির্যাতিত, নিপীড়িত বা মিথ্যা মামলায় কারাগারে আছেন, তারও কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।”
তিনি খাগড়াছড়ি জেলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জিতেন বড়ুয়ার নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানিয়ে বলেন, “একজন সাংবাদিকের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার নিশ্চিত করা গণতন্ত্র ও মুক্ত গণমাধ্যমের পূর্বশর্ত।”
*শেষ কথা*
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মুক্ত সাংবাদিকতা অপরিহার্য। কলমের স্বাধীনতা রক্ষা না পেলে সত্য চাপা পড়ে যায়। তাই সময় এসেছে, সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত করার।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
