বিশেষ প্রতিবেদক:—উপসচিব মো. আব্দুল কুদ্দুসকে চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে পদায়ন করতে ২৯ কোটি টাকার একটি গোপন ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত ৩০০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিপত্র, ট্রাস্ট ব্যাংকের চেকের কপি এবং উক্ত উপসচিবের নিজস্ব স্বাক্ষর সংবলিত ‘সম্মতিপত্র’ বিডি পোস্ট এর হাতে এসেছে।
নথিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি উচ্চপদ বাগিয়ে নিতে প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে কীভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন ও লিখিত সমঝোতা করা হয়েছে।
◼️চুক্তিপত্র ও দলিলের বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১.ব্যবসায়িক চুক্তিপত্রের বিষয়বস্তু:
তিন পৃষ্ঠার ৩০০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত এই চুক্তির তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ মে ২০২৫। চুক্তিপত্রে ১ম পক্ষ হিসেবে রয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান (পিতা: আলহাজ্ব মফিজুর রহমান, বরগুনা) এবং ২য় পক্ষ হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (পিতা: মো. সাখাওয়াত হোসেন, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ)।
চুক্তির মূল বিষয় ছিল— ২য় পক্ষ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সহায়তায় ১ম পক্ষের স্বজন ও ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আব্দুল কুদ্দুসকে (আইডি নম্বর: ১৬০৯৭) চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়নের নোটিফিকেশন লেটার এনে দেওয়া।
২.আর্থিক লেনদেন ও চেকের বিবরণ:
চুক্তি বাস্তবায়নে সংগৃহীত ডকুমেন্টে মোট ৬টি ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের চেকের তথ্য পাওয়া গেছে, যা ১ম পক্ষ মো. মনিরুজ্জামান ২য় পক্ষকে প্রদান করেন। ব্যাংকের হিসাব নম্বর: 0002-0210412765 (হিসাবের নাম: M/S SAYMON AND SAMIA ENTERPRISE, PROP: MD. MANIRUZZAMAN)।
প্রাপ্ত চেকের কপিগুলোতে দেখতে পাওয়া টাকার বিবরণ:
চেক নম্বর C9507381: ১০ কোটি টাকা (Ten Crore Taka Only)
চেক নম্বর C9507382: ৩ কোটি টাকা (Three Crore Taka Only)
চেক নম্বর C9507383: ২ কোটি টাকা (Two Crore Taka Only)
এছাড়াও চুক্তিপত্রের তথ্য অনুযায়ী মোট ৬টি চেকে কোটি কোটি টাকা জামানত ও পেমেন্ট হিসেবে রাখা হয়েছে।
৩.মূল শর্তাবলী:
নোটিফিকেশন লেটার ও কার্যকারিতা: চুক্তি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ডিসির নোটিফিকেশন লেটার সফলভাবে অর্জিত হলে ২য় পক্ষ পরবর্তী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কাজের মূল অর্থ বুঝে পাবেন। কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে ২য় পক্ষ সমস্ত চেক ১ম পক্ষকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন।
জামানতের চেক:নোটিফিকেশন লেটার পাওয়ার পর কাজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে ১ম পক্ষ ২য় পক্ষকে মূল টাকা প্রদান করবে এবং ২য় পক্ষ চেকে উল্লেখিত জামানতের অর্থ ও মূল চেক ফেরত দেবে।
৪.উপসচিবের নিজস্ব সম্মতিপত্র ও স্বাক্ষর:
১২ মে ২০২৫ তারিখে লিখিত একটি বিশেষ ‘সম্মতিপত্রে’ উপসচিব মো. আব্দুল কুদ্দুস (২৭তম বিসিএস প্রশাসন, আইডি-১৬০৯৭) নিজ স্বাক্ষরে অঙ্গীকার করেন:
“সম্মতি দিচ্ছি যে, আমাকে চট্টগ্রাম জেলায় জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন করা হলে আমি সেখানে যোগদান করে দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করব।”
৫.সাক্ষী ও পরিচয়:
চুক্তিপত্রের ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় স্পষ্ট দেখা যায়,১ম সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন মো. আব্দুল কুদ্দুস নিজেই (উপসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আইডি: ১৬০৯৭)। এছাড়াও ২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে মো. আইয়ুব হক এবং ৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে মো. আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষর করেছেন।
প্রশাসনিক ও জনস্বার্থ উদ্বেগ
প্রশাসনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদ ‘জেলা প্রশাসক’ (ডিসি)। এই পদ হস্তান্তরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক চুক্তি ও চেক বিনিময়ের দলিল ফাঁস হওয়ায় প্রশাসনিক মহলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি পদে নিয়োগ বা পদায়নে যদি এ ধরনের কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন জড়িত থাকে, তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। যারা বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে পদায়ন পাবেন, তারা যোগদানের পর জনগণের সেবার চেয়ে নিজের বিনিয়োগ করা অর্থ অবৈধ উপায়ে তুলে আনতেই মনোযোগী হবেন।
এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি উঠেছে।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
