কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: তৌহিদুর রহমান—খুলনার কয়রা উপজেলার ফুলতলা বাজারে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়ার আসর বসার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাজারের কয়েকটি চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে চলছে অনলাইন জুয়ার লেনদেন। তাঁদের অভিযোগ, এর ফলে এলাকার তরুণদের একটি অংশ দ্রুত জুয়ার দিকে ঝুঁকছে এবং পরিবার ও সামাজিক জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলতলা বাজারে একাধিক জুয়ার মাস্টার এজেন্ট সক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভ্যানচালক মো. ওজিয়র রহমান গাজীর ছেলে মো. শাহাদাত হোসেন অন্যতম বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শাহাদাত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার মাস্টার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা বা কর্মসংস্থান না থাকলেও দামি মোটরসাইকেল ব্যবহার এবং জমি কেনাকাটার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই মাস আগে জুয়ার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের ঘটনায় কয়রা থানায় একটি অভিযোগও করা হয়েছিল। এ ছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে জুয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি প্রশাসনের কিছু সদস্যকে নিয়মিত মাসিক অর্থ দেওয়ার কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, অর্থ লেনদেন ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অস্বীকার করে শাহাদাত হোসেন বলেন, তিনি তাঁর দুলাভাইয়ের সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেন, শাহাদাতকে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন চায়ের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায়। তিনি কোন কাজ করেন না। সে কোন দিনও রাজ মিস্ত্রির কাজ করেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সকাল থেকে বাজারের কয়েকটি চায়ের দোকানে বসে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লেনদেন করার অভিযোগ রয়েছে শাহাদাতের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের কার্যক্রমের কারণে বাজারে জুয়ার বিস্তার ঘটছে এবং তরুণদের একটি অংশ এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জিএম আশিক নামে এক তরুণ নিজেকে জুয়ার একজন ভুক্তভোগী দাবি করে বলেন, শাহাদাত তাঁকে জুয়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। পরে ধাপে ধাপে তিনি প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করেন আশিক। তাঁর ভাষ্য, জুয়ার কারণে তিনি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘সবকিছু হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। পরিবারের সঙ্গেও থাকতে পারছি না। আমি এর বিচার চাই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, শাহাদাতসহ আরও কয়েকজন ‘মাস্টার এজেন্ট’ এলাকার যুবকদের জুয়ার সঙ্গে যুক্ত করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘এভাবে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। পরিবারের আয়-রোজগারের টাকা জুয়ায় চলে যাচ্ছে, অনেকে ঋণগ্রস্তও হচ্ছে,’ বলেন তিনি। তাঁর দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বললে সংঘবদ্ধভাবে হামলার আশঙ্কা থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকেই মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যোগদানের পর জুয়া সংক্রান্ত একটি ঘটনায় মামলাও হয়েছে। জুয়ার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
খুলনা জেলা পুলিশের ডি-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আমির হামজা বলেন, ‘জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। জুয়ার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, জুয়া ও মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। জুয়া বা মাদকসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জুয়ার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি, তাঁর পরিচয় বা প্রভাব যাই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
