চট্টগ্রামের হোটেল-রেস্তোরাঁয় এবার পরিচ্ছন্নতার লাগাম টানছে প্রশাসন ১০ দিনের সময়, প্রতি শনিবার চলবে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম

এম এ রাশেদ চৌধুরী:—চট্টগ্রাম নগর ও জেলার হোটেল-রেস্তোরাঁয় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নোংরা রান্নাঘর, অস্বাস্থ্যকর খাবার সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন না থাকা এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে টয়লেট ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন। খাবারের মান ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোকে ১০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

এই সময়ের মধ্যে রান্নাঘর ও খাবার পরিবেশনের স্থান পরিচ্ছন্ন রাখা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, টয়লেট ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি, খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের নির্ধারিত মান এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে চারটি দল হোটেল-রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করবে।

পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশ, রান্নাঘর, খাবার সংরক্ষণ, স্যানিটেশন, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অগ্নিনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হবে। এরপর হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর মান যাচাই করে গ্রেডিং করা হবে। নির্ধারিত মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোমবার হোটেল-রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সভায় হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিক, ব্যবসায়ী, খাদ্যসংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও জরিমানা করা হলেও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাঙ্ক্ষিত মান পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে না। তাই শুধু অভিযান ও জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে চায় প্রশাসন।

তিনি বলেন, ‘সরকার জরিমানার মাধ্যমে কোনো ব্যবসা করে না। যাঁরা অসৎ পথে ব্যবসা করেন, তাঁদের সংশোধনের পথে নিয়ে আসার জন্যই জরিমানা করা হয়।’

মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বা ব্যবসা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত করা প্রশাসনের উদ্দেশ্য নয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের পর কোনো অজুহাত গ্রহণ করা হবে না। হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের মানের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তার মান অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, মানুষের বাইরে থেকে খাবার সংগ্রহের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ভবিষ্যতে হোটেল-রেস্তোরাঁনির্ভরতা আরও বাড়বে। ফলে শুধু সুস্বাদু খাবার নয়, খাবার তৈরির স্থান থেকে শুরু করে পরিবেশন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা জরুরি। এমন আস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ চট্টগ্রামের যেকোনো ভালো মানের হোটেল-রেস্তোরাঁয় নিশ্চিন্তে খাবার খেতে পারেন।

সভায় ‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগানে জেলা প্রশাসনের চলমান পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকেরা। তাঁরা প্রতি শনিবার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার অঙ্গীকার করেন।

জেলা প্রশাসক হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকদের উদ্দেশে বলেন, শুধু প্রশাসনের অভিযানের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করলে হবে না। প্রতিদিন রান্নাঘর, খাবার পরিবেশনের স্থান, টয়লেট, হাত ধোয়ার স্থান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পচা বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি খাবার নিরাপদভাবে প্রস্তুত ও সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস সিলিন্ডার ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে রয়েছে কি না, তাও পরিদর্শনের আওতায় থাকবে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামকে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাবারের ক্ষেত্রে দেশের জন্য উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সুনাম রয়েছে। নিরাপদ ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম নেতৃত্ব দিতে পারে।

তিনি বলেন, প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে। তবে সহযোগিতার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ১০ দিনের মধ্যে ঘাটতি সংশোধন করে হোটেল-রেস্তোরাঁকে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এরপর পরিদর্শনে অনিয়ম পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।