সিরাজুল হক সরকার ময়মনসিংহঃ—গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে যে স্বপ্ন একদিন জন্ম নিয়েছিল কৈয়ারচালার মাটিতে, মেধা, অধ্যবসায় আর নিরলস পরিশ্রমে সেই স্বপ্ন আজ ছুঁয়েছে সাফল্যের নতুন দিগন্ত। কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে চিকিৎসক, আর সেখান থেকে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা এ যেন এক সংগ্রামী জীবনের গর্বিত অধ্যায়ের গল্প।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ৭ নং বাকতা ইউনিয়নের কৈয়ারচালা গ্রামের কৃতি সন্তান ডাঃ মোহাম্মদ জুয়েল। নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের ক্যারিয়ারেই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেননি, বরং নিজ গ্রাম, ইউনিয়ন ও সমগ্র ফুলবাড়ীয়ার তরুণ প্রজন্মের জন্য তৈরি করেছেন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ডাঃ মোহাম্মদ জুয়েল আল-হেরা একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি জিপিএ-৫.০০ অর্জন করেন। এরপর তাঁর স্বপ্নের পথ আরও বিস্তৃত হয়। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড হাসপাতাল) থেকে ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি (বিডিএস) ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিক সাফল্য ও চিকিৎসা পেশায় নিষ্ঠার পর এবার তিনি অর্জন করেছেন আরও বড় মর্যাদা। বর্তমানে তিনি ৪৮তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী ডেন্টাল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কৈয়ারচালা নতুন বাজারসংলগ্ন মসজিদের পশ্চিম পাশে তাঁদের বাড়ি। তাঁর পিতা মোঃ আশরাফ আলী একজন কৃষক এবং মাতা জুলেখা গৃহিণী। সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা জুয়েল প্রমাণ করেছেন সফলতার জন্য বড় পরিচয়ের চেয়ে বড় প্রয়োজন স্বপ্ন, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের অন্যতম সন্তান। তাঁর রয়েছে এক ভাই ও দুই বোন। ২০২৩ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি এক কন্যাসন্তানের জনক।
ডাঃ মোহাম্মদ জুয়েলের এই সাফল্যের খবরে পরিবার, স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে গর্বের অনুভূতি। কৈয়ারচালার মানুষের কাছে তাঁর সাফল্য যেন নিজেদের ঘরের একটি স্বপ্নের সাফল্য। বিশেষ করে গ্রামের শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর পথচলা হয়ে উঠতে পারে ‘আমরাও পারি’ বিশ্বাসের এক শক্তিশালী উদাহরণ।
জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি আজহারুল আলম রিপন বলেন, ডেন্টাল সার্জন ডাঃ মোঃ জুয়েল মিয়া আল-হেরা একাডেমির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে পড়াশোনার প্রতি গভীর মনোযোগ, শৃঙ্খলা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
তিনি বলেন, জুয়েলের এই সাফল্য আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি আজ বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েছেন এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর এই অর্জনের পেছনে যেমন তাঁর নিজের কঠোর পরিশ্রম রয়েছে, তেমনি তাঁর বাবা-মায়ের ত্যাগ, পরিবারের সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের অবদানও রয়েছে। জুয়েল শুধু নিজের পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেননি, তিনি কৈয়ারচালা গ্রামের পাশাপাশি ফুলবাড়ীয়ার মানুষের জন্যও সম্মানের কারণ হয়েছেন। তাঁর সাফল্য আমাদের এলাকার শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে। আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য যখন অন্য দশজন শিক্ষার্থীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়, তখন সেই সাফল্য আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
ফুলবাড়ীয়া সমিতি, ময়মনসিংহের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রশীদ তামান্না ডাঃ মোহাম্মদ জুয়েলের সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, ডাঃ মোহাম্মদ জুয়েলের এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, আমাদের পুরো ফুলবাড়ীয়ার জন্যই আনন্দ ও গর্বের বিষয়। তাঁর মতো মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণরা আমাদের সমাজের আশার আলো।
তিনি বলেন, আমি ডাঃ জুয়েলের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য ও সফলতা কামনা করি। চিকিৎসা জগতে তিনি তাঁর মেধা, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে একটি সুন্দর অবস্থান তৈরি করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তাঁর সাফল্যের পথ আরও দীর্ঘ হোক, তাঁর কর্মের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হোক।
অ্যাডভোকেট তামান্না আরও বলেন, আজকের তরুণদের সামনে ডাঃ জুয়েলের জীবন একটি ইতিবাচক উদাহরণ। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য থেকেও একজন মানুষ যদি লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিশ্রম করে, তাহলে সাফল্যের দরজা অবশ্যই খুলে যায়। আমি আশা করি, তাঁর এই সাফল্য ফুলবাড়ীয়ার অন্যান্য শিক্ষার্থীকেও পড়াশোনা ও আত্মপ্রত্যয়ের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে উৎসাহিত করবে। মানুষের সেবা ও কল্যাণে তাঁর মেধা কাজে লাগুক এই প্রত্যাশা করি। তাঁর জন্য ফুলবাড়ীয়াবাসীর ভালোবাসা ও শুভকামনা সবসময় থাকবে।
একজন কৃষকের সন্তান থেকে চিকিৎসক এবং এরপর বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ জুয়েলের এই পথচলা যেন বলে দেয়, স্বপ্ন কখনো ছোট নয়। প্রয়োজন শুধু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
কৈয়ারচালার মাটিতে বেড়ে ওঠা এই তরুণ চিকিৎসকের সাফল্য আজ তাঁর পরিবারকে যেমন গর্বিত করেছে, তেমনি গর্বিত করেছে তাঁর শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীকে। তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি দিন মানবসেবা, সততা ও নিষ্ঠায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক এমন প্রত্যাশাই এখন কৈয়ারচালাবাসীর।
ডেন্টাল সার্জন ডা: মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, আমার এই অর্জনের পেছনে আমার বাবা-মা, পরিবারের সদস্য, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের দোয়া, ভালোবাসা ও সহযোগিতা রয়েছে। তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে মানুষের সেবা করার যে সুযোগ পেয়েছি, তা নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে পালন করতে চাই। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন ভবিষ্যতে মানুষের কল্যাণে আরও বেশি অবদান রাখতে পাারে।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
