কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা—চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক সিডিএ আবাসিক এলাকার পূর্ব পাশে এস আলম গ্রুপের মাঠে মাসব্যাপী ‘দেশীয় পণ্য মেলা’ আয়োজনকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। মেলা আয়োজনের অনুমোদন, মাঠ ব্যবহারের বৈধতা, স্টল বরাদ্দ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইমরানের সংশ্লিষ্টতায় মেলাটি আয়োজন করা হয়েছে। তবে মেলার অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই বলেও অভিযোগ করছেন তারা।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, কসমেটিকস, খাবার, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের অর্ধশতাধিক স্টল রয়েছে। এসব স্টলে প্রায় ৮৮টি ‘বক্স’ স্থাপনের কথাও জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বক্সের জন্য ৬৫ হাজার টাকা করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, সে হিসাবে শুধু বক্স ভাড়া থেকেই প্রায় ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায়ের হিসাব দাঁড়ায়।
এ ছাড়া ইনফ্লেটেবল স্পাইডারম্যান স্লাইড/স্লিপার দোলনার এক মাসের স্থান ভাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ভাড়া বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে। আরও প্রায় আটটি বিনোদন স্পট রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির জন্য আনুমানিক ২ লাখ টাকা করে ধরলে আরও প্রায় ১৬ লাখ টাকা। তবে একটি বিনোদন স্পটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি দাবি করেন, টিকিট বিক্রির ৫০ শতাংশ মেলা কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।
মেলা প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার দর্শনার্থী প্রবেশ। শুধু প্রবেশ ফি থেকেই দৈনিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
স্টল, বিনোদন স্পট ও প্রবেশ ফি—সব মিলিয়ে মেলাকে ঘিরে কোটি টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এসব অর্থের প্রকৃত হিসাব, আয়-ব্যয়ের বিবরণ এবং কারা অর্থ সংগ্রহ করছেন—তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্টল নেওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ব্যবসা না হলেও নির্ধারিত ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে হবে। তবে প্রয়োজনে কিছুটা কম দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তারা। আবার কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেন, স্টলের ভাড়ার পরিমাণ প্রকাশ না করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছে।
এদিকে মেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য দিয়ে খাবার তৈরি করে পরিবেশন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ক্রেতা ও স্থানীয় ব্যক্তি এ অভিযোগ করেন।
তাদের অভিযোগ, মেলায় বিক্রি হওয়া কিছু পণ্যের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ ব্যবহার করে খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেছেন। পণ্যের স্বাভাবিক দামের চেয়ে বেশি দাম নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মেলার কারণে মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে মেলার ব্যস্ত সময়ে সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। এতে পথচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
মেলার অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে আয়োজক মোহাম্মদ ইমরান বলেন, জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ১০ দিনের জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এক মাসের অনুমতি নেওয়া হবে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে মেলাটি ১৬ আগস্ট উদ্বোধন করা হয়েছে। আয়োজকের বক্তব্য অনুযায়ী যদি জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ১০ দিনের অনুমোদন নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে উদ্বোধনের পর ইতোমধ্যে সেই ১০ দিনের সময়সীমাও পার হয়ে গেছে। এরপরও মেলার কার্যক্রম চলমান থাকায় অনুমোদনের মেয়াদ এবং পরবর্তী সময়ের অনুমতির বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া ১০ দিনের অনুমোদন নিয়ে এক মাসের জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে স্টল ও বিনোদনমূলক স্থাপনার জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মেলার অনুমোদনপত্র দেখতে চাইলে আয়োজক মোহাম্মদ ইমরান তা দেখার সুযোগ রয়েছে বলে জানান। তবে তিনি নথি চাইতে পারবেন না বলেও মন্তব্য করেন। পরে তার মোবাইলে একটি নথি দেখানো হয়। সেখানে কোনো আবেদন বা নথি জমা দেওয়ার বিষয়টি দেখা গেলেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেছে—এমন স্পষ্ট সিল, স্বাক্ষর বা তথ্য দেখা যায়নি।
স্থানীয় নেতা বাবলু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটি নিয়ে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি মেলার আয়োজক মোহাম্মদ ইমরানকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হিসেবে উল্লেখ করে অনুমোদন ছাড়া মেলা আয়োজনের অভিযোগ তোলেন। একই পোস্টে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-নেত্রীর সঙ্গে ইমরানের ছবি প্রকাশ করা হয়।
তবে পরে বাবলুর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে এবং বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই।
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রনেতা দাবি করেন, মেলা নিয়ে আপত্তি তোলার পর বাবলু সেখান থেকে ২ লাখ টাকা নিয়েছেন এবং ওই অর্থের একটি অংশ স্থানীয় কয়েকজন নেতাকেও দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মেলার আয়োজক মোহাম্মদ ইমরান দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর সঙ্গে ১৫বছর ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করেছেন এবং তাদের সঙ্গে তার একাধিক ছবি রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর মোহাম্মদ বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। মেলার বিষয়টা আমার আগের ওসি সাহেব তাদের সাথে কথা বলে নাকি অনুমতি দিয়েছে, কত দিনের অনুমতি দিয়েছে বা কিভাবে দিয়েছে সেটা আমি জানিনা। বিষয়টা আমি খোঁজ নিয়েোো দেখব।”
এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিদুয়ানুল ইসলামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, মেলা আয়োজনের অনুমোদন, মাঠ ব্যবহারের বৈধতা, স্টল ও বিনোদন স্পটের নামে আদায়কৃত অর্থ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
