২০২০ সালে করোনা মহামারির অভিঘাত ২০২১ সালের শুরুতে অনেকটাই সামলে নিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে বছরের মাঝামাঝিতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশকে।
ভাইরাসের নতুন ধরন ডেলটার কারণে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার বদলে উলটো কোভিড পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে থাকে। দ্রুত পালটাতে থাকে সার্বিক চিত্র। এক পর্যায়ে হাসপাতালে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থার মধ্যে ভয়ংকর হয়ে ওঠে পুরো চিত্র। বছরের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণের তীব্রতায় শনাক্ত ও মৃত্যুর মিছিল দিনের পর দিন রেকর্ড ভেঙে দেশ জুড়ে ভয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে ব্যাপকভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রম, কয়েক দফায় নজিরবিহীন কঠোর লকডাউন ও নানা বিধিনিষেধের মধ্যে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করার ইতিবাচক ফলও মিলেছে। হু হু করে বাড়তে থাকা কোভিড সংক্রমণ অবশেষে আগস্টের শেষ দিক থেকে নিম্নমুখী হতে থাকে। এমন স্বস্তির মধ্যেই কোভিডের নতুন আরেকটি ধরন চোখ রাঙাচ্ছে বছরের এক বারে শেষ ভাগে এসে।
বিশ্বের শতাধিক দেশে দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে ওমিক্রন। দেশে চার জন ওমিক্রনে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন। সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে ওমিক্রন সেইভাবে দেশে ছড়িয়ে পড়েনি। তার পরও সতর্কমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মঙ্গলবার থেকে করোনার তৃতীয় টিকা বা বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে। যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং যারা কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে আছেন তারাই বুস্টার ডোজ পাচ্ছেন।
এদিকে করোনা মোকাবিলা, চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধিসহ সার্বিকভাবে ২০২১ সালে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়লেও অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টিও ছিল আলোচনায়। এ বছর স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির খবরের মধ্যে হঠাৎ সামনে আসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরির ঘটনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি নথি চুরির ঘটনাটি ব্যাপকভাবে জানাজানি হয় ২৮ অক্টোবর মন্ত্রণালয় রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়ারি (জিডি) করার পর। জিডিতে ১৭টি নথির নম্বর ও বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল।
এর মধ্যে ছিল: শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজসহ কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজের কেনাকাটা সংক্রান্ত একাধিক নথি, নিপোর্টের কেনাকাটা, ট্রেনিং স্কুলের যানবাহন বরাদ্দ ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি। এছাড়া নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্পের নথি খোয়া যায়। বছরের পর বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে চলেছে।
তাই মন্ত্রণালয় থেকে কেনাকাটার নথি চুরি যাওয়ার ঘটনায় অনেকে মনে করেছিলেন যে যোগসাজশ ছাড়া এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। এ নিয়ে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ঐ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী চার কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু কেন নথি চুরি বা গায়েব হলো অথবা খোয়া গেল, তা মন্ত্রণালয় খোলাসা করে কিছু বলেনি আজও।
বিশ্ব মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ও মৃত্যু রোধে এখনো পর্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে করোনার টিকাপ্রাপ্তি বড় অর্জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১২ কোটি ২ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৭ কোটি ১১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮২ জন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪২ দশমিক ২৯ শতাংশ। পূর্ণ ডোজ পেয়েছেন ৪ কোটি ৯১ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৬ জন। এ সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ। এখনো মজুত আছে ৬ কোটি ৬৩ লাখ ৫২ হাজার ২২৮ ডোজ টিকা।
দেশে প্রথম গত ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু বেরোনিকা কস্তাকে করোনার টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে মহামারি নিয়ন্ত্রণের নতুন যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে করোনার গণটিকাদান শুরু হয়। দেশে এখন পাঁচ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত টিকা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার, সিনোফার্ম, মডার্না ও সিনোভ্যাক।
টিকা সংকটের সমাধান হয় যেভাবে
মহামারিকালে সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি দেশের মানুষকে করোনা ভাইরাসের টিকার আওতায় আনতে ২০২০ সাল থেকেই কাজ শুরু করে সরকার। ঐ বছর ৫ নভেম্বর অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৩ কোটি ডোজ কোভিশিল্ড টিকা আনতে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তিও হয়।
কোভিশিল্ডের টিকা প্রথম আসে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি; ঐদিন ভারত সরকারের উপহার দেওয়া ২০ লাখ ডোজ টিকা পায় বাংলাদেশ। উপহারের দ্বিতীয় চালানে ১২ লাখ ডোজ টিকা আসে ২৬ মার্চ। সরকারের কেনা ৩ কোটি ডোজ টিকার প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ আসে ২৫ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় চালানে ২৩ ফেব্রুয়ারি আসে আরো ২০ লাখ ডোজ। এরপর ভারতে ডেলটার আক্রমণে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দেশটি টিকা রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে।
এতে বাংলাদেশ সরকারের কেনা ও উপহার মিলিয়ে ১ কোটি ২ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার পর নতুন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে শুরু হওয়া টিকা কর্মসূচি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এক পর্যায়ে টিকা সংকট দেখা দিলে গত ২৫ এপ্রিল করোনা ভাইরাসের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া স্থগিত করা হয়। টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া চালু থাকলেও মজুত ফুরিয়ে গিয়ে পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রমও হয়।
অনেক স্থানে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া অলিখিতভাবে বন্ধ করা হয়। এ সময়কালে সরকারের বিকল্প উদ্যোগের ফসল হিসেবে ১২ মে চীনের সিনোফার্মের টিকার ৫ লাখ ডোজ বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। ১ জুন কোভ্যাক্স সহায়তা থেকে ফাইজার-বায়োএনটেকের ১ লাখ ৬২০ ডোজ টিকা আসে। এসব টিকা হাতে এলে দুই মাস সাত দিন পর ১ জুলাই ফের শুরু হয় টিকাদান কর্মসূচি।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে



