স্টাফ রিপোর্টার-ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি–ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি গ্রামে স্পিডবোটের ভাড়া নিয়ে তুচ্ছ ঘটনার জেরে প্রকাশ্যে গুলি ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলম (৩৪) নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোমবার (২৭ জুলাই) মরিচাকান্দি বউ বাজারে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে মরিচাকান্দি ঘাটে স্পিডবোট চালক আসাদুল্লাহর (২৫) সাথে ইমরান (৩২) নামের এক যাত্রীর ১০০ টাকা ভাড়া ও একটি শিশুকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা হয়। স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি আপোষ-মীমাংসা করে দিলেও আসামিরা ক্ষোভ পুষে রাখে।
পরে জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মরিচাকান্দি পূর্বপাড়ায় জনৈক ফরিদ মিয়ার বাড়ির পাশে আসাদুল্লাহর পথরোধ করে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। তারা লাঠিসোঁটা, রামদা, হকি স্টিক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবারও এই একই চক্রের হাতে আল-আমিন নামের এক সিএনজি চালক মসজিদের ভেতরে মারধরের শিকার হয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
প্রকাশ্যে গুলি ও হত্যাচেষ্টা
আসাদুল্লাহকে মারধরের খবর পেয়ে তার ভাই দেলোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলমসহ স্বজনরা তাকে বাঁচাতে ছুটে যান। এ সময় হামলাকারীদের মধ্যে শরীফ (২৮) নামের এক যুবক তার কোমর থেকে পিস্তল বের করে হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে। এতে জাহাঙ্গীর আলমের নাভির নিচে গুলি লাগে এবং তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
হামলাকারীরা অন্যান্যদেরও লোহার রড ও হকি স্টিক দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। পরে শোরগোল শুনে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। মুমূর্ষু অবস্থায় জাহাঙ্গীরকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতাল এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
পুলিশের অভিযান ও মামলা দায়ের
খবর পেয়ে বাঞ্ছারামপুর মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত জব্দ করে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে:
০২ (দুই) রাউন্ড গুলির খোসা।
০১ (এক) রাউন্ড অবিস্ফোরিত গুলি ও ফায়ারকৃত গুলির সামনের অংশবিশেষ।
০১ (এক) টি নেভিব্লু রঙের পিস্তলের কভার।
০৩ (তিন) টি রামদা ও ১০ (দশ) টি প্লাস্টিকের পাইপ।
এ ঘটনায় আহত জাহাঙ্গীরের ভাই মোঃ দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে বাঞ্ছারামপুর মডেল থানায় শরীফ, ইমরান, কাদির সরকারসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৭/৮ জনকে আসামি করে ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৬/৩০৭/৫০৬ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং- ২০) দায়ের করেছেন।
মানববন্ধন ও এলাকাবাসীর ক্ষোভ
এ হামলার প্রতিবাদে সোমবার মরিচাকান্দি এলাকার সর্বস্তরের জনগণ, মুরুব্বিয়ান ও যুবসমাজের অংশগ্রহণে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, মরিচাকান্দি একটি ঐতিহ্যবাহী ও শান্তিপ্রিয় গ্রাম। বাপ-দাদার আমলে এমন প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা কেউ কখনো দেখেনি। কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল যুবক ও অস্ত্রধারীদের কারণে এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
মোঃ দেলোয়ার হোসেন (মামলার বাদী) তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রশাসন মামলা নিলেও এখনো কোনো বড় অপরাধীকে ধরতে পারেনি। আধুনিক যুগে প্রশাসন চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমরা প্রশাসনের কার্যকলাপে নিরাশ। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এলাকার জনগণ নিজেদের গতিতে এগিয়ে যেতে বাধ্য হবে।”
দুলাল মিয়া (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক):তিনি বলেন, “আমার ৫৪ বছর বয়সে এমন প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা দেখিনি। এই ঘটনার পর এলাকার ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা চরম আতঙ্কে আছেন। আমরা দ্রুত এই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার চাই।”
রিপন মিয়া (আহবায়ক, স্বেচ্ছাসেবক দল): তিনি বলেন, “কয়েকজন লোকের জন্য আমাদের গ্রামের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য নষ্ট হতে যাচ্ছে। আমি গ্রামবাসীকে অনুরোধ করব এই উচ্ছৃঙ্খল লোকদের কোনো প্রশ্রয় না দিতে।”
রিয়াজ ব্যাপারী:তিনি উল্লেখ করেন, “যে ছেলেটা ঘটনা ঘটিয়েছে, সে আগেও এমন অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে। শুরুতেই এদের দমন না করলে মরিচাকান্দি অস্ত্রে ভরপুর হয়ে যাবে।”
মতি মেম্বার ও দিলদার হোসেন বড় মিয়া ডাক্তার:তারা গ্রামের অতীত শান্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, শান্তিপ্রিয় গ্রামে অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কোনো স্থান নেই।
সমাবেশ থেকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, অনতিবিলম্বে চিহ্নিত মদদদাতাদের খুঁজে বের করে অবৈধ অস্ত্রের উৎস বন্ধ করতে হবে। ঘাটের বোট চালকদের যেন কোনো কুচক্রী মহল নিজেদের গ্রুপিং রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানানো হয়। দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় না আনা হলে এলাকাবাসী আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে আল্টিমেটাম দেন।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
