রূপান্তর বাংলা -মহেশখালী সংবাদদাতা—ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায়।
স্বামীকে হারিয়ে এতিমখানায় দিয়েছেন দুই কন্যাকে। ১৫ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে থাকছিলেন শাশুড়ির সঙ্গে। এর মধ্যেই পুলিশের এক তদন্ত কর্মকর্তার কথিত ভুয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৫ মাসের শিশুসহ তাকে পাঠানো হয়েছে কারাগারে। ৭ দিন পর জামিনে মুক্তি পেলেও প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে।
স্বামী মুহাম্মদ কাশেম হত্যার ঘটনায় মামলা করেছিলেন স্ত্রী ফাতেমা বেগম। স্বামীকে হারিয়ে দুই কন্যা সন্তানকে এতিমখানায় দিতে হয়েছে তাকে। আর ১৫ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে বসবাস করছিলেন তিনি।
এর মধ্যেই গত ৩১ আগস্ট রাতে আদালতের ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে পুলিশ ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা ননদ নাছিমা আক্তারকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরদিন রাশেদা বেগম ও নাছিমা আক্তার জামিন পেলেও ফাতেমা বেগমকে ১৫ মাসের শিশুসহ কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে তারা জানতে পারেন, ফাতেমার স্বামী মুহাম্মদ কাশেমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে গোপনে একটি মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলার বিষয়ে ফাতেমারা আগে কিছুই জানতেন না।
ফাতেমার ১৫ মাসের শিশুকে নিয়ে কারাগারে যাওয়া এবং দুই কন্যা শিশুর কান্নার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সাত দিন কারাভোগের পর ৭ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান ফাতেমা।
তবে ফাতেমার বিরুদ্ধে করা ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এখন উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই মোজাহারুল ইসলাম, বিপি নং-৭৫৯৩০২৬৯৩৬। তিনি বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালী থানার অধীনে মাতারবাড়ী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি, দেবর, ননদ, ভাসুর ও মামা শ্বশুরসহ মোট সাতজন নুর জাহানের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন।
কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে স্থানীয়দের বক্তব্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি ও মিথ্যা তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার এজাহারে থাকা ছয়জন সাক্ষীর মধ্যে তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছে রূপান্তর বাংলা। তাদের বক্তব্য, ফাতেমা বেগম বা তার পরিবারের লোকজন ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছে এমন কোনো সাক্ষ্য তারা পুলিশকে দেননি। এমনকি তাদের নাম সাক্ষী তালিকায় কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না। তিনজনই নিশ্চিত করেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে নুর জাহানের বাড়িতে ঘরবাড়ি ভাঙচুর বা লুটপাটের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহমুদুল করিম এবং কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল ও একই তথ্য দিয়েছেন। তাদের দাবি, ২৪ মে ওই এলাকায় কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজিত লোকজন অভিযুক্তদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাদী নুর জাহানের বাড়ির পাশে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই হত্যা মামলায় বাদীর ছেলে মোহাম্মদ রাসেলকে অন্যায়ভাবে আসামি করা হয় এবং সেই ঘটনার জেরেই আসামিরা নুর জাহানের বাড়িঘর ভাঙচুর করে।
কিন্তু প্রতিবেদনে যে হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, সেটি যে ফাতেমা বেগমের স্বামী মুহাম্মদ কাশেম হত্যাকাণ্ড, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। আর যাকে প্রতিবেদনে ‘অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে’ বলা হয়েছে, সেই মোহাম্মদ রাসেলই মুহাম্মদ কাশেম হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত ৪ নম্বর আসামি।
এ বিষয়ে জানতে এসআই মোজাহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তদন্তের কাজ অনেক আগে করেছেন। তাই বিষয়টি তার এখন মনে নেই। রাসেলকে ‘অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে’ এমন তথ্য কোন ভিত্তিতে উল্লেখ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি এ ধরনের কিছু লেখেননি। পরে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানান। তবে পরে আর কোনো তথ্য দেননি।
জাতীয় সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ (জেএসকেপির) চেয়ারম্যান মোঃ রিয়াজ উদ্দীন রানা বলেন
একজন পুলিশ কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই একজন স্বামীহারা নারীকে তার ১৫ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ সাত দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তার দুই কন্যাশিশুকে থাকতে হয়েছে এতিমখানায়।
এখন প্রশ্ন হলো, তদন্ত প্রতিবেদনে যদি সত্যিই ভুল তথ্য, অসঙ্গতি বা তথ্য গোপনের ঘটনা থেকে থাকে, তাহলে এর দায় কে নেবে?
এটি শুধু একটি পরিবারের কষ্টের বিষয় নয়, এটি তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও পুলিশের জবাবদিহিরও প্রশ্ন। তাই তদন্ত প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে এসআই মোজাহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
