রূপান্তর বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন—বীরত্বের ৪০ বছর, প্রাপ্তি মাত্র ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা– সবুজে মোড়ানো উঁচু-নিচু পাহাড়, মেঘের কোলে হারিয়ে যাওয়া অরণ্য, ঝর্ণার কলকল ধ্বনি আর সাঙ্গু-কর্ণফুলীর বয়ে চলা – এই হলো আমাদের রূপের রানী পার্বত্য চট্টগ্রাম। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক স্বপ্নরাজ্য।
কিন্তু এই অপার সৌন্দর্যের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। যে পাহাড় আজ পর্যটকদের কাছে শান্তির নীড়, সেই পাহাড়কেই চার দশক ধরে বুকের রক্ত দিয়ে আগলে রেখেছেন একদল সূর্যসন্তান – হিল আনসার ভিডিপি। একসময় যাদের লাল বাহিনী নাম শুনলেই শান্তিবাহিনী কাঁপতো। ত্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে যাদের ছিল পথ চলা।
আশির দশকে যখন এই সুন্দর পাহাড় অশান্ত, চারদিকে বারুদের গন্ধ, তখন এই রূপের রানীকে রক্ষা করতে গঠন করা হয় হিল আনসার ভিডিপি। স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি সাহসী যুবকদের নিয়ে গড়া এই বাহিনীই ছিল সেনাবাহিনী, পরে বিজিবি ও পুলিশের চোখ ও কান। দুর্গম গিরিখাত, গোপন সুড়ঙ্গ, অরণ্যের প্রতিটি গোপন পথ তাদের নখদর্পণে।
পাহাড়ের সমরে এসআরপি, এলআরপি, অ্যাম্বুশ, রেকি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনে সামনে থাকতেন তারাই। অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে পঙ্গু হয়েছেন এই অরণ্যের বুকেই।
অথচ ৪০ বছর পরেও তাদের জীবন চলে সামান্য সম্মানী ভাতার উপর। বর্তমানে হিল ভিডিপির সাধারণ সদস্যরা মাসে পাচ্ছেন মাত্র ৩০০০ টাকা। আর পিসি, এপিসি, হাবিলদার, নায়েক, ল্যান্স নায়েক, কমান্ডার পদে যারা আছেন তারা পাচ্ছেন ৩৫০০ টাকা। এখানে সিনিয়র-জুনিয়রের কোনো পার্থক্য নেই। বিশেষ করে রাজস্থলীসহ বিভিন্ন জায়গায় তারা কোনো রেশন সুবিধাও পাচ্ছেন না।
শুধু পাহাড় পাহারা নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সব জায়গায় তাদের ব্যবহার করা হয়। জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্র পাহারা দেয় এই হিল ভিডিপিরাই। প্রতিদিন রাতে যখন মানুষ আরামে ঘুমায়, তখন সারারাত ডিউটি করে পাহারা দেন তারা।
এছাড়া গাছ লাগানো থেকে শুরু করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে, হরতালে, যখনই সরকারের যে কোনো কাজের প্রয়োজন পড়ে তখনই তারা সর্বদা প্রস্তুত থাকেন। অথচ এই সামান্য টাকার বিনিময়ে তাদের সাথে অনেক বড় প্রতারণা করা হচ্ছে।
নেই কোনো স্থায়ী বেতন, নেই রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি, অবসরে গেলে নেই কোনো পেনশন। ৪০ বছর ধরে শুধু আশ্বাসের ফাইল চালাচালি হচ্ছে।
যে পাহাড়কে তারা রূপের রানী করে সাজিয়ে রেখেছেন নিজেদের জীবন দিয়ে, সেই পাহাড়ের কোলে আজ তাদের জীবনই সবচেয়ে অবহেলিত।
প্রশ্ন একটাই, এই সবুজ অরণ্যের বীর প্রহরীদের আত্মত্যাগ কি এভাবেই অরণ্যের আড়ালে হারিয়ে যাবে, নাকি রাষ্ট্র এবার তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেবে?
লেখক: কলামিস্ট মোঃ রিয়াজ উদ্দিন রানা
রূপান্তর বাংলা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপান্তর বাংলা অনিয়মের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে
