সংবাদ শিরোনাম

মৃত্যুর ১২ বছর পর ‘আসামি’ সাবেক এমপি সুলতানুল কবির! সম্পত্তি দখলের অভিযোগে নালিশি মামলা, আসামির তালিকায় মৃত সাবেক সংসদ সদস্য; বাদীর দাবি আইনজীবীর লেখার ভুল

এম এ রাশেদ চৌধুরী:—-মৃত্যুর এক যুগ পরও ‘আসামি’ হলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতানুল কবির চৌধুরী! সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বাঁশখালীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা একটি নালিশি মামলায় ১৩ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তিনি ২০১৪ সালের ৩০ জুন মৃত্যুবরণ করেন।

ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মামলার বাদী পারভীন আক্তার দাবি করেছেন, এটি ইচ্ছাকৃত নয়; তাঁর আইনজীবী নাম লেখার সময় ভুল করায় মৃত সাবেক সংসদ সদস্যের নাম মামলায় চলে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে আসামি হওয়ার কথা ছিল সাবেক চেয়ারম্যান ও সুলতানুল কবির চৌধুরীর ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতানুল গণি চৌধুরীর।

মামলার নথিতে মৃত ব্যক্তির নাম

আদালতে দাখিল করা নালিশি দরখাস্তে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৫, ৩০৭, ৪২৭, ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮৫, ৩৮৭, ৩৫৪ ও ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আসামির তালিকায় ১৩ নম্বরে লেখা হয়েছে ‘সুলতানুল কবির চৌধুরী (৫৫), পিতা মৃত ফজুল কবির চৌধুরী’। কিন্তু সরকারি ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত তথ্য অনুযায়ী, সাবেক এই সংসদ সদস্য ২০১৪ সালের ৩০ জুন মারা যান। অর্থাৎ মামলার তারিখের প্রায় ১২ বছর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

নাম লেখার সময় ভুল হয়েছে’—বাদী

মামলার বাদী পারভীন আক্তার বলেন, তাঁর আইনজীবী লেখার সময় ভুলবশত সুলতানুল কবির চৌধুরীর নাম লিখেছেন। প্রকৃতপক্ষে আসামি হিসেবে সুলতানুল গণি চৌধুরীর নাম থাকার কথা ছিল।

বাদীর অভিযোগ, ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি জবরদখল করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। ঘটনার সময় সুলতানুল গণি চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনারাই আমার পৈতৃক সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করেছেন। পুলিশের সহযোগিতায় আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।’

একদিন আগে সম্পত্তি দখল ঘিরে উত্তেজনা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতানুল কবির চৌধুরীর ছোট ভাই ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতানুল গণি চৌধুরী (লেদু মিয়া)-এর দুই তলাবিশিষ্ট মার্কেটের কার্যালয়, দোকান ও বোর্ডিং জোরপূর্বক দখল করে টিনের ঘেরা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে রশিদ আহমদ ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, যেকোনো সময় সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

‘ঘটনার সময় আমি কলম্বোতে’ প্রধান আসামি

মামলার প্রধান আসামি ইয়াসিন আরাফাত চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মামলায় যে তারিখে ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময় তিনি শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার জেঠা সুলতানুল কবির চৌধুরী প্রায় ১২-১৩ বছর আগে মারা গেছেন। তাঁকেও একই মামলায় আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর।’

পুলিশের অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল হকের নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে।

এ সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে দখলদারদের উচ্ছেদ করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

প্রশ্ন উঠছে মামলার নির্ভুলতা নিয়ে

একজন মৃত ব্যক্তিকে কীভাবে মামলার আসামি করা হলো এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। বাদীর দাবি অনুযায়ী এটি যদি কেবল নাম লেখার ভুল হয়, তাহলে আদালতে দাখিল করা নালিশি দরখাস্ত প্রস্তুত ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

অন্যদিকে সম্পত্তি দখলের অভিযোগ, উচ্ছেদ এবং পরবর্তী মামলার ঘটনায় দুই পক্ষের বক্তব্যে রয়েছে স্পষ্ট ভিন্নতা। ফলে প্রকৃত ঘটনা কী এবং মামলায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি কতটা সঠিক তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।

তবে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে ২০১৪ সালে মারা যাওয়া একজন সাবেক সংসদ সদস্য ২০২৬ সালের একটি মামলায় কীভাবে আসামি হলেন?